গত অর্ধ দশক ধরে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক আলোচনার পরিসরে ‘জেন-জি’ (Gen-Z) শব্দটি একপ্রকার বুজওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। মূলত আমেরিকান সমাজের বয়সভিত্তিক সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ (Weaponizing Youth) থেকেই এই শব্দটির জন্ম। স্ট্রস-হাও প্রজন্ম তত্ত্বের মতো গবেষণামূলক ভাবনাগুলি এই ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলে। প্রথমদিকে, জেন-জি শব্দটি একেবারেই নিরীহ অর্থে ব্যবহৃত হতো—১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০১০-এর শুরুর দিকে জন্ম নেওয়া এক প্রজন্মের আচরণ, মানসিকতা ও জীবনযাপনের ধরন বোঝাতে। এই প্রজন্মকে আগের প্রজন্মগুলোর থেকে আলাদা করেছিল মূলত ইন্টারনেটের স্বাভাবিকীকরণ এবং তথ্যের বিস্ফোরণ। যুক্তির নিরিখে দেখলে, এই ধারণাটি আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সামাজিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা ছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই শব্দটির সঙ্গে ভারতের (ভারত) নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতার তেমন কোনো সরাসরি যোগ নেই।
তবুও, আজকের বাস্তবতা হলো—‘জেন-জি’ (Weaponizing Youth) আর কোনো নিরীহ শব্দ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে, আন্তর্জাতিক স্তরে প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক শক্তি এই শব্দটিকে সচেতনভাবে রাজনৈতিক রঙে রাঙিয়েছে। বাংলাদেশে (আগস্ট ২০২৫) এবং নেপালে (সেপ্টেম্বর ২০২৫) ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতাকে বিশ্ব মিডিয়ার একাংশ ‘জেন-জি অসন্তোষ’-এর ফল হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই ঘটনাগুলি আসলে ওই সরল ব্যাখ্যার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। বরং ভারতে আমরা দেখেছি, কিছু রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যেই তরুণ সমাজকে উসকানি দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাস্তায় নামানোর স্বপ্ন দেখছেন।
আরও পড়ুনঃ Drones Spotted Along LoC: নওশেরায় পাকিস্তানি ড্রোনে গুলি চালাল ভারতীয় সেনা
নিঃসন্দেহে বলা যায়, ‘জেন-জি’ শব্দটি এখন এমন এক রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা সরকার ও সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। যেসব রাজনৈতিক শক্তি বারবার নির্বাচনে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, তারা যুবসমাজকে হাতিয়ার করে ক্ষমতার সমীকরণ বদলানোর আশায় বুক বাঁধছে। ভোটকেন্দ্রে পরাজয়ের বদলা নিতে তারা ‘সহিংস যুব আন্দোলন’-এর পথে হাঁটতে চাইছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাগাতার উসকানিমূলক বার্তা, ভুয়ো খবর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারের মাধ্যমে ভারতীয় যুবসমাজকে ক্ষেপিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এই উসকানির পদ্ধতিগুলি নতুন নয়। স্মার্টফোনের পর্দায় সূক্ষ্ম প্রচার থেকে শুরু করে কখনও প্রকাশ্য বিশৃঙ্খলার ডাক—সবই এর অন্তর্ভুক্ত। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA), ২০১৯-এর বিরোধিতার সময় দাবি করা হয়েছিল, এই আইন ভারতে বসবাসকারী মুসলমানদের অধিকার কেড়ে নেবে। বাস্তবে এই দাবির কোনো ভিত্তি ছিল না। তবুও লাগাতার প্রচারের মাধ্যমে যুবসমাজকে (Weaponizing Youth) বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন দিল্লির ভয়াবহ দাঙ্গায় রূপ নেয়, যা আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার ষড়যন্ত্র বলেই অনেকেই মনে করেন। একইভাবে, ২০২০ সালের কৃষি আইনগুলির বিরোধিতাও ‘এমএসপি উঠে যাবে’—এই ভ্রান্ত ধারণার উপর দাঁড় করানো হয়েছিল।
তবে আশার কথা হলো, এই সব উসকানি ভারতীয় যুবসমাজকে আর সহজে প্রভাবিত করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো, ভারতীয় যুবকদের বুদ্ধিমত্তা ও পরিণতিকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। বারবার মিথ্যা প্রচার ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের মুখোমুখি হতে হতে তারা এখন অনেক বেশি সতর্ক। পরিবারকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা ভারতীয় সমাজে আজও শক্তিশালী (Weaponizing Youth)। পরিবারের মধ্যে প্রজন্মগত আলোচনা তরুণদের বিষয়গুলিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে শেখায়, যা শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই সম্ভব।
ভারতীয় যুবসমাজ তাই পশ্চিমা ‘জেন-জি’ ধারণার ছাঁচে নিজেকে ফেলে না। আজও ছাত্রসমাজের মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দের ছবি ও ভাবনা গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। বিবেকানন্দ যুবশক্তির প্রতীক—শুধু শক্তির নয়, ধর্ম ও নৈতিকতারও। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ফোরণের যুগে ভারতীয় যুবসমাজ (Weaponizing Youth) নতুন করে ধর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছে। অতীতের ইতিহাস, ঔপনিবেশিক বিকৃতি ও মধ্যযুগীয় নৃশংসতার বাস্তবতা এখন উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডারে উপলব্ধ। এই জ্ঞান যুবসমাজকে তার শিকড়ের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ধর্মনিষ্ঠ এই চেতনা ভারতীয় যুবসমাজের জন্য এক অদম্য ঢাল। যতদিন এই ঢাল তাদের হাতে থাকবে, ততদিন কোনো আরোপিত ‘জেন-জি’ বিদ্রোহ বা উচ্ছৃঙ্খলতার ছক তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না।
