উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাত শহরে নিপাহ ভাইরাসে (Nipah Virus Alert in Bengal) আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহে দুই স্বাস্থ্যকর্মী বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সোমবার (১২ জানুয়ারি, ২০২৬) রাজ্য প্রশাসনের তরফে এই তথ্য জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রবিবার গভীর রাতে (১১ জানুয়ারি, ২০২৬) নদিয়ার কল্যাণীতে অবস্থিত অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস (AIIMS)-এ এই সন্দেহভাজন দুটি কেস শনাক্ত হয়।
আরও পড়ুনঃ Drones Spotted Along LoC: নওশেরায় পাকিস্তানি ড্রোনে গুলি চালাল ভারতীয় সেনা
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী সাংবাদিকদের জানান, “দু’জন রোগীই (Nipah Virus Alert in Bengal) বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তাঁদের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁদের শনাক্ত করতে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং শুরু হয়েছে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।” তিনি সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ করেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার উপর জোর দেন মুখ্যসচিব। রাজ্য সরকারের তরফে সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য তিনটি হেল্পলাইন নম্বর চালু করা হয়েছে— ০৩৩-২৩৩৩-০১৮০, ৯৮৭৪৭০৮৮৫৮ এবং ৯৮৩৬০৪৬২১২।
নিপাহ সন্দেহে তিন জেলায় কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং-
নিপাহ মোকাবিলায় কেন্দ্র–রাজ্যের যৌথ টিম-
এদিন মুখ্যসচিবের সঙ্গে সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম। তবে রোগীদের পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে তাঁরা দু’জনেই অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, রোগীদের গোপনীয়তা রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত। রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই দুই স্বাস্থ্যকর্মী সম্প্রতি ব্যক্তিগত কাজে পূর্ব বর্ধমান জেলায় গিয়েছিলেন। সেই কারণেই উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান এবং নদিয়া— এই তিন জেলায় ব্যাপক কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং (Nipah Virus Alert in Bengal) চালানো হচ্ছে। যদিও তাঁরা সম্প্রতি রাজ্যের বাইরে কোথাও যাননি বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
নিপাহ ভাইরাসের (Nipah Virus Alert in Bengal) মতো গুরুতর সংক্রামক রোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র সরকারও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানিয়েছে, রাজ্য সরকারকে সহায়তা করতে একটি জাতীয় যৌথ আউটব্রেক রেসপন্স টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এই দলে রয়েছেন কলকাতার অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড পাবলিক হাইজিন, পুনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ভাইরোলজি (NIV), চেন্নাইয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি (NIE), AIIMS-কল্যাণী এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের অধীন বন্যপ্রাণ দপ্তরের বিশেষজ্ঞরা।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক শীর্ষ আধিকারিক জানান, “নিপাহ ভাইরাস (Nipah Virus Alert in Bengal) একটি জুনোটিক রোগ, যার মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই পরিস্থিতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করা হচ্ছে।” কেন্দ্রের তরফে রাজ্যের ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভেইল্যান্স প্রোগ্রাম (IDSP)-এর কাছে নিপাহ সংক্রান্ত সমস্ত নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (NCDC)-এর অধীনে পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার (PHEOC) সক্রিয় করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি ফোনেও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। রবিবার গভীর রাতে মুখ্যমন্ত্রী নিজেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে যান বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
বাদুড়বাহিত নিপাহ, সতর্কতাই প্রধান অস্ত্র-
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সুবর্ণ গোস্বামী জানান, নিপাহ মূলত বাদুড়বাহিত ভাইরাস (Nipah Virus Alert in Bengal) হলেও কিছু ক্ষেত্রে শূকর থেকেও সংক্রমণ ঘটতে পারে। এই ভাইরাসের ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিন। তাই প্রাথমিক ও গৌণ— উভয় ধরনের সংস্পর্শকারীদের শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও জানান, শীতকালে খেজুরের কাঁচা রস থেকেও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, কারণ বাদুড় অনেক সময় খেজুর গাছে বসে। তাই কাঁচা রস না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে ফুটিয়ে তৈরি গুড় নিরাপদ। নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ সাধারণত জ্বর, শরীর ব্যথা, গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট। গুরুতর ক্ষেত্রে খিঁচুনি ও তীব্র শ্বাসজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এই রোগের এখনও কোনও টিকা নেই। তাই সংক্রমণ রোধে কড়া নজরদারি, আইসোলেশন ও চিকিৎসাই একমাত্র উপায়।
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে শেষবার নিপাহের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল ২০০৭ সালে। দেশে সর্বশেষ সংক্রমণ ধরা পড়ে কেরলে ২০২৫ সালের আগস্টে। বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসন ও চিকিৎসক মহল সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
