২৪ আওয়ার্স টিভি ডেস্ক : ক্ষমতায় আসার পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বাস্থ্যর পরিকাঠামো ও চিকিৎসা পরিষেবার মান বৃদ্ধির কথা বললেও,জেলার কয়েকটি গ্রামীণ হাসপাতাল গুলির বাস্তব চিত্র কিন্তু অন্য।সেখানে চিকিৎসা পরিষেবা, পরিকাঠামো,রক্ত পরীক্ষা,এক্স-রে,ইসিজি,ফিজিওথেরাপিস্ট, ডাক্তার ও ওষুধের আকাল তো আছেই।তার সঙ্গে জলা জঙ্গলে ভরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ,পানীয় জলের অভাব ও রাতের অন্ধকারে বিষধর সাপের আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে শ্রীরামপুর উত্তরপাড়া ব্লকের কানাইপুর গ্রামীণ হাসপাতালকে।গ্রামীণ হাসপাতালে লাগানো ফলকের তথ্য অনুযায়ী ১৯৬২ সালে কানাইপুর আরোগ্য নিকেতন নামে স্বাস্থ্য কেন্দ্রের শিলান্যাস হয়।সেখানেই কয়েক বিঘা জমির উপরে ডানা মেলেছে প্রায় ৬৩ বছরের পুরনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র।মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচার করার পর রুটিন চেক আপের জন্য হাসপাতালে এসে ছিলেন কানাইপুর বারোয়ারি তলার গৃহবধূ শোভা দাস।তিনি বলেন,সকাল থেকে না খেয়ে ১০ টায় হাসপাতালে এসে ছিলাম খালি পেটে রক্ত পরীক্ষা করাতে।এগারোট পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর বলা হল রক্ত পরীক্ষা হবে না, বুধবার আসতে।বলুন তো না খেয়ে এতক্ষণ থাকা যায় বলে আক্ষেপ করেন শোভা।
নৈটি রোডের পাশেই কানাইপুর গ্রামীণ হাসপাতাল।মূল দরজা দিয়ে ঢোকার মুখেই বা দিকে হাসপাতালের নাম খোদাই করা মূল ভবন।সেখানে ব্লক হাসপাতালের আধিকারিক(বিএমওএইচ) ও অন্যান্য কর্মীরা বসেন।বাম দিকের একটি করে ল্যাব টেকনিশিয়ানেরা বসেন।সেখানে রোগীদের রক্ত ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।মূল ভবনের উলটো দিকেই বড় বড় বেনাঘাসের জঙ্গল।তার পাশেই বন্ধ একটি ঘর।কিছুটা এগিয়ে সামনে বর্হিবিভাগ।টিনের ছাউনি দেওয়া।পাশের রাস্তার ডানদিকে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকা দাঁতের ডাক্তারের ঘর। পাশের পরিত্যাক্ত দুটি ঘরের পাশে এক মানুষ সমান আগাছা আর জঙ্গল।সেখানে বিষধর সাপের ডেড়া।পাশেই একটি বড় জলসত্র।২০১৮ সালে তৈরি জলসত্রর ফলক রোদ বৃষ্টিতে ঝলসে গেলেও পড়তে অসুবিধা হয়নি।কিন্তু জলসত্রে কল থাকলেও জলের দেখা মেলেনি।হাসপাতালে আসা রোগী ও রোগীর আত্মীয়রা জানিয়েছেন হাসপাতালে তিনটে জলসত্রই বিকল।এখানে এসে জলের পিপাসা পেলে জল বাইরে থেকে কিনে খেতে হয়। শৌচালয়ের অবস্থা আরো করুণ।হাসপাতালের মূল গেটের সামনেই অস্পূর্ণ শৌচালয় মুখ ঢেকেছে জঙ্গল আর আগাছায়।দরজা নেই,জলের কোনো ব্যবস্থা নেই।যে কারণে হাসপাতালে আসা রোগীর আত্মীয়রা খোলা আকাশের নীচেই শৌচ করেন বলে অভিযোগ।
রাজ্যে তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর রাজ্য সরকার হাসপাতালের সার্বিক উন্নয়ন ও পরিকাঠামোর সংস্কার করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষ প্রশাসকের অভাবে মার খাচ্ছে গ্রামীণ হাসপাতালের চিকিৎসা পরিষেবা।কানাইপুর গ্রামীণ হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে ৩০ শয্যার গ্রামীণ হাসপাতালে রয়েছেন ৬ জন চিকিৎসক, ৭ জন নার্স,তৃতীয় শ্রেণীর কর্মী ৪ ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী ১ জন ও কর্মবন্ধু ৪ জন।দাঁতের ডাক্তার পড়াশুনার জন্য বিদেশ পাড়ি দেওয়ার দন্ত বিভাগে তালা পড়েছে।নতুন চিকিৎসক এখনো নিযুক্ত হন নি।চিকিৎসক না মেলায় গ্রামীণ হাসপাতালে বন্ধ চোখের চিকিৎসা ও।প্রতিদিন বর্হিবিভাগে কয়েকশ রোগী ভিড় জমান।কোন্নগর,কানাইপুর,ডানকুনি,খড়িয়াল,চাকুন্দি ও রিষড়ার বাসিন্দাদের কাছে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার ভরসার স্থল এই হাসপাতাল।সাধারণ জ্বর, সাপে কামড়, কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের টিকা থাকলেও দুর্ঘটনা বা একটু খারাপ উপসর্গের রোগী এলেই উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল বা শ্রীরামপুর সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে রেফার করা হয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সৌমেন দাস নামে এক রোগীর আত্মীয়।
অভ্যন্তরীণ পরিষেবার ছবিও হতাশাজনক।রোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালে এক্স-রে, ইসিজির কোনো পরিকাঠামো নেই।হাসপাতালে প্রসূতিদের জন্য ১০২ পরিষেবায় অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সাধারণ রোগীদের জন্য হাসপাতালের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবা নেই।ডাক্তারের সংখ্যা অপ্রতুল,নেই চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীও।রোগীর আত্মীয়কেই রোগীকে ধরে নিয়ে যেতে হয়। হাসপাতালে এসি নেই, জরুরি এক্স-রে সুবিধা নেই নিজস্ব।প্রসূতি বিভাগও ততটা আধুনিক নয়।হাসপাতালের ভিতরে পর্যাপ্ত আলো নেই।রাতের অবস্থা আরো খারাপ।রাত্রি ৮ টার পর হাসপাতালে রোগী নিয়ে এসে ওয়ার্ডের মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।রাতে চিকিৎসক থাকলেও দরজার বেল বাজালে নার্সেরা বিরক্ত হন। রোগী কে ঠিক মতো পরীক্ষা না করেই রেফার লিখে দেন। নার্সদের বিরুদ্ধে চরম দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ও তুলেছেন রোগীর আত্মীয় মানসী প্রামাণিক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাসপাতালের সদর দরজা ঢোকার মুখেই রাস্তায় ধস নেমেছে।অনেকদিন ধরে ঠিক মতো অ্যাম্বুলেন্স ও শববাহী গাড়ি ঢুকতে অসুবিধায় পড়ছে।কানাইপুর পঞ্চায়েতের উপপ্রধান ভবেশ ঘোষ বলেন,হাসপাতালের মূল গেটের সামনে রাস্তায় যেখানে ধস নেমেছে সেটা মেরামত করে নতুন করে তৈরির প্রক্রিয়া চলছে৷আমরা জলসত্র তৈরি করে ছিলাম।এখন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে সেটা স্বাস্থ্য দপ্তর বলবে।শৌচালয় চালু করার বিষয়ে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর দৃষ্টি আকর্ষণ করব। হাসপাতালের পরিষেবার মান নিয়ে বিএমওএইচ শ্রেয়া পট্টনায়েক বলেন,জেলায় চার জন চোখের চিকিৎসক।
সেই কারণে এখন কাউকে পাওয়া যায়নি।দন্ত বিভাগ থেকেও নতুন কোনো চিকিৎসক কে নিযুক্ত করা হয়নি।হাসপাতালে অসম্পূর্ণ জঙ্গলে ঢাকা শৌচালয় নিয়ে তিনি বলেন,ওটা পে অ্যান্ড ইউজ শৌচালয়।সেটা এখনো আমাদের হাতে দেওয়া হয়নি।সেখানে জলের কোনো সংযোগ নেই।জলসত্র গুলো বিকল হয়ে পড়ে থাকা নিয়ে তার সাফাই বাইরের লোকজন এসে জলসত্র গুলি থেকে জল নিয়ে যায়।সে কারণে সেগুলি বিকল হয়ে পড়েছে।হাসপাতালে আগাছার জঙ্গল ও বিষধর সাপের আতঙ্ক নিয়ে তিনি বলেন,লোক নিয়োগ করা হয়েছে।জঙ্গল পরিস্কারের কাজ চলছে।
